পাবলিক স্পিকিং নিয়ে ভয়?
যত যাই বলা হোক না কেন, পাবলিক স্পিকিং আর প্রেজেন্টেশন নিয়ে আমাদের ভয়টা বেশ পুরোনো। দু’টো কাজেই অনেক মিল থাকলেও একটুখানি পার্থক্যও আছে। প্রেজেন্টেশন ব্যাপারটা এখনও ক্লাসরুম, মিটিং রুমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে এই প্রেজেন্টেশন জিনিসটাই যখন বড় কোনো কনফারেন্স রুম বা মিলনায়তনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে অনেক মানুষের সামনে দিতে হয় তখন সেটা আবার পাবলিক স্পিকিং হয়ে যায়। পুঁথিগত সংজ্ঞার দিকে না হয় আর না গেলাম। চলুন জেনে নেই কিছু পরামর্শ যেগুলো কি না আপনাকে একজন চমৎকার বক্তা হিসেবে তুলে ধরতে সাহায্য করবে।

কীভাবে শুরু করবেন:
বক্তব্যের শুরুতে দর্শকের মনোযোগ আর বক্তার ভয় দুটোই থাকে একেবারে চূড়ায়। তাই এই ব্যাপারটা কাজে লাগাতে হবে। এই প্রথম ১০-১৫ সেকেন্ডে দর্শক সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবে যে তাঁরা আপনার পরবর্তী কথাগুলো শুনবে নাকি না। তাই শুরুটা এমনভাবে করতে হবে যাতে করে দর্শকের আগ্রহটা জন্মানোর আগেই নষ্ট না হয়ে যায়। গল্প, ফ্যাক্ট, প্রশ্ন, মজার কোনো প্রাসঙ্গিক তথ্য এর যে কোনো কিছু দিয়ে হতে পারে আপনার বক্তব্যের শুরু।

বরফ ভাঙ্গার খেলা:
আমরা সাধারণত কোনো ইভেন্টে গেলে পরিচিত মানুষদের মধ্যেই ঘুরপাক খাই। বন্ধু বা কলিগ ছাড়া অন্য কারও পাশে বসিও না। একটা বিষয় মাথায় রাখা জরুরি একটা ইভেন্টে কিন্তু মোটামুটি সমমনা মানুষেরাই যায়। তাই আপনার আশেপাশের মানুষগুলো আপনার অচেনা হলেও তাদের আগ্রহ কিন্তু আপনার আগ্রহের সাথে মেলে। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে এখানে উপস্থাপক কী করবে। উপস্থাপক আসলে এই ব্যাপারটাই সবাইকে মনে করিয়ে দেবে যে ইভেন্টের প্রতিটি মানুষের আগ্রহের বিষয়বস্তুটা আসলে একই। দর্শকদের দিয়ে মজার কোনো এঙ্গেজিং অ্যাক্টিভিটি করাতে পারেন যেটা তাদের মধ্যকার অভন্তরীন জড়তার বরফটাকে ভেঙ্গে গলিয়ে ফেলবে।

দর্শক নিয়ে গবেষণা:
একজন বক্তা হিসেবে আপনার কাজ হবে আপনি কাদের সামনে কথা বলতে যাচ্ছেন তাদের নিয়ে আগে থেকে ধারণা নিয়ে যাওয়া। তাদের পছন্দ, আগ্রহের বিষয়াদি নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি করে নিয়ে এরপর সেটার সাথে মিল রেখে নিজের বক্তব্য তৈরি করে ফেলা। এতে করে একটা সুবিধা হবে, আপনি দর্শকের সামনে কোনো অপ্রাসঙ্গিক কথা, উক্তি বা তথ্য বলে ফেলার ঝুঁকি কম থাকবে।

দর্শকদের অংশগ্রহণ:
দর্শকদের মধ্যকার জড়তা ভেঙ্গে ফেলার মানে কিন্তু এই নয় যে এরপর আপনি একাই শুধু কথা বলে যাবেন আর দর্শক সেগুলো শুনে যাবে। আপনার বক্তব্যের সাথে দর্শকদের কানেক্ট করুন। ছোট ছোট কাজ করতে বলুন। একটা উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে, কিছুদিন আগে TEDx এ একটা ছোট্ট বক্তব্য দেবার সুযোগ হয় আমার। সেখানে কথা বলেছিলাম কী করে আমাদের স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়। ধরা যাক আপনিও স্বপ্ন নিয়েই কথা বলছেন। স্বপ্নগুলোকে লিখে ফেললে সেটা লক্ষ্যে পরিণত হয়। একটা কাজ করুন না। আপনার দর্শকদেরকেও বলুন নিজের স্বপ্নটা চট করে তারিখসহ লিখে ফেলতে! ব্যস, দর্শক কানেক্টেড!

চোখাচোখি:
কারও চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা কারও কারও কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। কিন্তু একজন পাবলিক স্পিকার বা উপস্থাপক তো আর মঞ্চের ফ্লোরের দিকে তাকিয়েও কথা বলতে পারবেন না তাই না? তো করা কী যায়? যে মিলনায়তন বা হল রুমে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, সেটার সামনের দিকে কয়েকটা পয়েন্ট সেট করে রাখুন। কথা বলার সময় ঘুরে ফিরে ওগুলোর দিকে তাকান, এতে করে ফ্লোরের দিকে কিংবা কারও চোখের দিকে না তাকিয়েও চোখাচোখি তথা আই কন্ট্যাক্ট মেইনটেইন করা যাবে।

মঞ্চভীতি:
মঞ্চে দাঁড়িয়ে অনেক মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বক্তব্য সবার সামনে তুলে ধরাটা মামুলি কোনো কাজ নয়। এতে ভয় না পাওয়াটাই উল্টো অস্বাভাবিক। ভয়টাকে একবারে বিদায় করা না গেলেও একটুখানি কমানো সম্ভব। আগেভাগে মঞ্চটার সাথে পরিচিত হয়ে নিন। মঞ্চে উঠে হাঁটাহাঁটি করুন। স্পিচটা বলে প্র্যাকটিস করুন ইভেন্ট শুরুর আগে। কোন কোন পয়েন্টগুলোর দিকে তাকিয়ে আই কন্ট্যাক্ট মেইন্টেইন করবেন সেটা নির্ধারণ করুন। দেখবেন ভয় অনেকটা কেটে গেছে।

বডি ল্যাঙ্গুয়েজ: 
আমরা মুখে যতখানি কথা বলি তাঁর চেয়ে অনেক বেশি মনের ভাব প্রকাশ করি আমাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে। আমাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজের মোট দুটো অংশ আছে!
১) Gesture: কথা বলা কিংবা কাউকে বোঝানোর সময় প্রয়োজনে আমরা অনেকেই হাত নেড়ে বোঝাই বা ব্যাখ্যা করি। এটাই হলো Gesture.
২) Posture: কথা বলার সময় আমাদের দাঁড়ানো কিংবা বসার ধরণটাই হলো প্রকৃতপক্ষে Posture.
কথা বলার সময় এই Gesture আর Posture যেন ভারসাম্য থাকে সে দিকে নজর রাখতে হবে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলতে হবে।

যেভাবে বক্তব্য তুলে ধরবেন:
বক্তব্য দেবার ক্ষেত্রে কী বলছেন তাঁর চাইতে কীভাবে বলছেন সেটা অনেক বেশি জরুরি। আপনার দর্শকদের বয়স, মানসিকতার সাথে মিলিয়ে নিজের কথাগুলো তুলে ধরুন। গল্প বলুন। এমন কিছু করুন যাতে দর্শক সেটার সাথে রিলেট করতে পারে।
ভুলেও স্ক্রিপ্ট হাতে নিয়ে মঞ্চে উঠবেন না। দেখেই যদি পড়বেন তাহলে পড়ার প্রয়োজন কী? দেখে দেখে পড়া আর বক্তব্য দেওয়া তো আর এক জিনিস নয়!

টপিক নিয়ে গবেষণা:
অধিকাংশ অনুষ্ঠানের বক্তব্যেই বক্তার বক্তব্যের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ধারণা দেওয়া হয় না। যে বিষয়টা নিয়ে কথা বলা হচ্ছে সেটা নিয়ে বিস্তারিত জানতে হলে কোথা থেকে সাহায্য নেওয়া যেতে পারে সেটা জানানো হয় না। বক্তব্য দেবার আগেই বিষয়বস্তু নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করুন। দেখে নিন আগে এই টপিক নিয়ে কে কী বলেছে। চিন্তা করুন ইউটিউব, টেড টক রেখে মানুষের আপনার কথা শুনে কী লাভ। চেষ্টা করুন যাতে অনলাইনে পাওয়া বক্তব্য আর পরামর্শগুলোর চেয়ে আপনার বক্তব্য আর পরামর্শগুলো আলাদা হয়। সহজ বাংলায় লোকের পয়সা উশুল করতে সাহায্য করুন।

ভেন্যু:
দর্শক আর টপিক নিয়ে গবেষণার কথা তো আগেই বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি ভেন্যু নিয়েও একটু আধটু ধারণা রাখলে আখেরে আপনারই সুবিধা। ইভেন্ট শুরুর অন্তত কিছুক্ষণ আগে গিয়ে দেখে নিন ভেন্যুর অবস্থা। আয়োজকদের সাথে পরিচিত হয়ে নিন। দেখবেন জায়গাটা আর অপরিচিত লাগছে না।

স্বরের ব্যবহার:
শুধুমাত্র আপনার কণ্ঠস্বরের ওঠানামা করেই আপনি আপনার বক্তব্যে একটা আলাদা মাত্রা যোগ করতে পারেন। এই কণ্ঠস্বরের অবস্থা কিন্তু আমাদের মধ্যকার আবেগগুলোকে ফুটিয়ে তোলে। তাই আনন্দ, দুঃখ, বিস্ময়ের মতো আবেগগুলো যখন বক্তব্যে তুলে ধরবেন তখন নিজের কণ্ঠস্বরটাকেও সাবলীলভাবে কাজে লাগান।

স্পিচ ডিলাইটস:
ভেন্যু, দর্শক আর টপিক নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে প্রায়ই দেখবেন এর সাথে প্রাসঙ্গিক কোনো না কোনো মজার ঘটনা, তথ্য পেয়ে যাবেন। এগুলো কাজে লাগান। সুযোগ বুঝে এগুলো আপনার বক্তব্যের সাথে জুড়ে দিন। দর্শক বেশ মজা পাবে। এই ব্যাপারগুলোকেই বলে স্পিচ ডিলাইটস।

গল্পের শক্তি:
নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের বিবৃতি মনে না থাকলেও নিউটনের মাথায় আপেল পড়ার পর যে মহাকর্ষ সূত্রটা আবিষ্কৃত হয়েছিল এই ব্যাপারটা আমাদের সবার মনে আছে। এই হলো গল্পের শক্তি। কারও মনে কোনো ব্যাপার বা ঘটনা গেঁথে ফেলতে চাইলে গল্প বলুন। গল্পের ছলে যা বোঝাতে চাইছেন বোঝান। অনেক দিন মনে রাখবে আপনাকে দর্শক।

সমাপ্তি:
শুকনো ধন্যবাদ দিয়ে আর কত বক্তব্যের শেষ করবেন বলুন তো? বক্তব্যের শেষে ব্যতিক্রম কিছু আনতে চাইলে এই শব্দ দুটোকে অতিক্রম করতে হবে! শুরুর মতো সমাপ্তিটাও করুন দর্শককে আরেক দফা চমকে দিয়ে। গল্প, উক্তি, ফ্যাক্ট, মজার কোনো প্রশ্ন কিংবা দরকারে এতক্ষণ যা যা বলেছেন সেটার সারমর্ম বলুন। অন্তত শুকনো ধন্যবাদের চেয়ে বেশি কাজে লাগবে।

নিজের মতামত, মনোভাব আর আইডিয়াকে সবার সামনে দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে তুলে ধরতে পারাটা একটা অনেক বড় দক্ষতা। একবার অর্জন করে ফেলতে পারলে দেখবেন একুশ শতকের প্রতিযোগিতার দৌড়ে আপনি কতখানি এগিয়ে!


Comments

Popular posts from this blog